চট্টগ্রাম,১৩ ডিসেম্বর, ২০২২:
শেয়ার বাজারের সব সূচক যখন প্রায় তলানিতে তখন ব্লক মার্কেটে কিছু লেনদেন হচ্ছে।
ব্লক মার্কেট কী এবং কিভাবে লেনদেন মানে কেনাবেচা চলে?
শেয়ার বাজারের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ব্লক মার্কেটকে সক্রিয় করা হয় বা সক্রিয় হয়।
যখন কোনো পরিস্থিতিতে বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি বা কম দামে ক্রেতা-বিক্রেতা নিজেদের মধ্যে দরদাম ঠিক করে শেয়ার লেনদেন করে তাকে ব্লক মার্কেট বলা হয়। যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ থাকে না। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বা বড় বিনিয়োগকারীরা ব্লকে বেশি লেনদেন করে। তবে যে কেউ চাইলে পাঁচ লাখ টাকার উপরের সমমানের শেয়ার ব্লক মার্কেটে লেনদেন করতে পারে। ব্লক ট্রেডে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকার ট্রেড করতে হবে। এভাবে ব্লক মার্কেটে ক্রেতাবিক্রেতা আগেই ঠিক করা থাকে। সেই সাথে দরদামও ঠিক করা থাকে। যখন তারা বাজারের চলতি দামে শেয়ার বেচাবিক্রি না করে নিজেদের মধ্যে দরদাম ঠিক করে নেয়। শুধু শেয়ারের আনুষ্ঠানিক হাতবদলটা হয় এ মার্কেটে। ডিএসই এর যে ট্রেডিং প্লাটফর্ম বা সফটওয়্যার আছে তার মাধ্যমেই ব্লক মার্কেটে লেনদেন করা হয়। সাধারণ মার্কেটের লেনদেনের মতই ব্লক মার্কেটে লেনদেন সম্পন্ন হয়।স্বাভাবিক মার্কেটে বড় ভলিয়মের লেনদেন মূল্য হ্রাস বা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করে। এই কারণেই স্বাভাবিক মার্কেটকে প্রভাব মুক্ত রাখতে ব্লক মার্কেটে লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ব্লক মার্কেটের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কেও থাকে। যখন ব্লক মার্কেটের লেনদেন স্বাভাবিক বাজার মূল্যকে প্রভাবিত কর। কিন্তু শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোম্পানির মৌল ভিত্তি ঠিক থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই।
আর মন্দা বাজারেই নয়, আর্থিক বছর শেষে প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের আয় বা মুনাফা বাড়িয়ে দেখাতেও এ কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। অর্থাৎ যখন আর্থিক হিসাবের (প্রান্তিক বা অর্ধবার্ষিক) সময় ঘনিয়ে আসে, তখনই ব্লকে লেনদেন বেড়ে যায়।তাতেই কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস বাড়ে, যা পরবর্তী সময়ে শেয়ারের দামেও প্রভাব ফেলে। এছাড়া একই আর্থিক ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের এক মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার অন্য মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যেও লেনদেন করা হয়।
বর্তমানে শেয়ারবাজার আটকে আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেওয়া সর্বনিম্ন দাম বা ফ্লোর প্রাইসে। বাজারের পতন ঠেকাতে গত জুলাইয়ে এ ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হয়েছিল। এতে শেয়ার বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হওয়ায় গত ১৫ নভেম্বর ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে শেয়ার বেচাকেনা করা যাবে- নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির এমন নির্দেশনার পর শুরু হয় ব্লক মার্কেট। এর পর দিন ব্লক মার্কেটে ৫০টি কোম্পানির মধ্যে ৩৩টির লেনদেন হয়েছে মূল বাজারের চেয়ে কম দরে। বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে কম দামে বেচা গেলেও সার্কিট ব্রেকারের নিচে নামা যাবে না। যদি কোনো কোম্পানির সার্কিট ব্রেকার ৬.৫ শতাংশ হয়, তাহলে একদিন সাড়ে ৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় দিন সাড়ে ৩ শতাংশ কমতে পারবে। যেকারণে বর্তমানে মন্দা বাজারে ফ্লোর প্রাইসের চেয়ে ১০ শতাংশ কমে ব্লক মার্কেটে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা। এটি করা হয়েছে মূলত কিছু কিছু শেয়ারের লেনদেন বাড়াতে।
অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এখন ব্লক মার্কেটে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ব্লক মার্কেটে শেয়ার লেনদেনের এ সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। কিছুটা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের লক্ষ্য থেকেই তারা কাজটি করছেন।
গত ১২ ডিসেম্বর,সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ব্লক মার্কেটে ৭১টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির ৮৪ কোটি ১৬ লাখ ৫ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আর ব্লক মার্কেটে ৩ কোম্পানির বিশাল লেনদেন হয়েছে। এই ৩ কোম্পানির লেনদেন হয়েছে ৪০ কোটি ৬৯ লাখ ৫১ হাজার টাকার শেয়ার। এর মধ্যে রয়েছে ঔষধ খাতের রেনেটা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক ও আনোয়ার গ্যাভ্যানাজিং। এছাড়া আরো বেশকিছু কোম্পানি ব্লক মার্কেটে লেনদেন করেছে।
ব্লক মার্কেট সম্পর্কে শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন তার ইউটিউব ব্লগে ব্লক মার্কেটকে পাইকারি ও পাবলিক মার্কেটকে খুচরো বাজার অভিহিত করে বলেন, পাইকারি বাজারে যেমন সবাই ট্রেড করতে পারে না, তেমনি ব্লক মার্কেটেও সকলে ট্রেড করতে পারে না। ব্লক মার্কেটে পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি পরিমাণে লেনদেন করতে হবে। পাঁচ হাজার শেয়ারের দাম যদি ৫ লাখ হয়, সেক্ষেত্রে তিনি ব্লক মার্কেটে বিক্রির জন্য অপার দিতে পারেন। অফারটা নিতে চাইলে তাকে পাঁচ লাখ টাকার পাঁচ হাজার শেয়ারই নিতে হবে। তবে দামের ব্যাপারে সমঝোতা হতে পারে। ব্লক ট্রানজেকশনে ব্রোকারেজ হাউস ও এক্সচেঞ্জ কমিশনও কমিশন কম নিয়ে থাকে। ব্লক মার্কেটের ট্রানজেশনটা স্টক এক্সচেঞ্জের টোটাল ট্রেডে রিফ্লেক্ট হবে। ব্লক মার্কেটের ট্রানজেকশন পাবলিক মার্কেটের সাথে যোগ হবে। তবে ইনডেক্সে এটা কোনো প্রভাব ফেলবে না। ব্লক মার্কেটের শেয়ার শেষ পর্যন্ত পাবলিক মার্কেটেই বেচাকেনা হয়। যা ব্লক মার্কেটের চেয়ে বেশি দামেই ট্রেড হবে এমন ধারণা করা যায়। যা যাচাই- বাছাই করা যায়। ডাইরেক্টরা যখন তাদের হোল্ডিংয়ের জন্য শেয়ার কেনাবেচা করে এটা রিটেইল মার্কেটে আসে না।
তবে ঝিমিয়ে পড়া শেয়ার বাজার কিছুটা চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৭.৪০ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ২৬৬.৯৫ পয়েন্টে। ডিএসইর অপর সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৮.০৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৩৭২.৩৪ পয়েন্টে এবং দুই হাজার ২১৩.৪৪ পয়েন্টে।
ডিএসইতে ৫৬৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১৫৪ কোটি ০৫ লাখ টাকা বেশি। আগের কার্যদিবস লেনদেন হয়েছিল ৪১৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৮৬.৫২ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৫৮.২৫ পয়েন্টে।সিএসইতে ৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।সিএসইতে ১৪২টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৩টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৭টির আর ৮২টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
Discussion about this post