চট্টগ্রাম,৩১ ডিসেম্বর’২০২২:
একুশে পদকে ভূষিত দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়- চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের বিখ্যাত শিল্পী শেফালি ঘোষ। আজ ৩১ ডিসেম্বর ১৬তম মৃত্যুবাষির্কী এই কিংবদন্তি শিল্পীর। ২০০৬ সালের এদিনে সন্ধ্যায় জীবনের সকল মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে সকল ভক্ত অনুরক্তদের শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে চিরকালের জন্য বিদায় নেন তিনি।
প্রায় পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে তিনি প্রায় সহস্রাধিক গান গেয়েছেন। তার গাওয়া গান নিয়ে দুই শতাধিকের বেশি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রের গানেও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় ২০টিরও বেশি দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। লন্ডনের রয়েল এলভার্ট হল ও কাতার, বাহারাইন, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কলিকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, বার্মা, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, জাপান, জর্ডান প্রভৃতি দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। লন্ডনের রয়েল এলভার্ট হলে তিনি গান পরিবেশন করে প্রশংসিত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়া গ্রামে ১৯৪১ সালে জন্ম হয় শেফালি ঘোষের। তাঁর পিতার নাম কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ ও মাতার নাম শ্রীমতি আশালতা ঘোষ।পরিবারের অনুপ্রেরণায় বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তার গান গাওয়ার এবং শেখার সূত্রপাত ঘটে। তার গানের প্রথম ওস্তাদ ছিলেন তেজেন সেন। পরবর্তীতে অধ্যক্ষ ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নদী, গোপালকৃষ্ণ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগীতজ্ঞের কাছে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন।
শেফালি ঘোষ ১০ বছর বয়স থেকে মাঠে-ময়দানে ঘরোয়া অনুষ্ঠান গান গাইতেন। বহু ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ ঋদ্ধ করে তুলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে অডিশন দিয়ে তৎকালিন রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত হন এ শিল্পী। ১৯৭০ সালে শেফালি ঘোষ যুক্ত হন টেলিভিশনের সাথে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কণ্ঠ যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন শেফালি ঘোষ। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গান গেয়ে বেড়াতন।শিল্পীজীবনের সূচনালগ্নে প্রথমে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত এবং আধুনিক গান শিখতে শুরু করলেও এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের লোকসঙ্গীত- অর্থাৎ আঞ্চলিক গান, পল্লিগীতি, মাইজভান্ডারী গান, পীর মুর্শিদের শানে রচিত গান গাওয়ার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেন।
পরবর্তীতে এম.এন আখতার, এম.এ কাশেম, আবদুল গফুর হালী ও সৈয়দ মহিউদ্দিন প্রমুখ গীতিকার ও সুরকারদের কাছ থেকে আঞ্চলিক গানের শিক্ষা লাভ করেন। এছাড়া বিশেষ করে স্বামী বাবু ননী গোপাল দত্ত সংগীতের ব্যাপারে গান বাছাই, গানের সুর, গানের কথা ইত্যাদি নিপুন ভাবে সব ধরনের সহায়তা করতেন।
শেফালি ঘোষ ও ননী গোপাল দত্তের একমাত্র ছেলে ছোটন দত্তও সংগীত অনুরাগী।
শেফালি ঘোষকে বিখ্যাত করার ক্ষেত্রে তার কণ্ঠে যেমন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের জাদু ছিল তেমনি তার সঙ্গীত জুটি শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবের সাথে তাদের গায়কীও তাদের দুজনকে খ্যাতি এনে দেয়। আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আঞ্চলিক গানের এই জনপ্রিয় জুটি দেশের মানুষকে গান শুনিয়ে যেমন আনন্দ দিয়েছেন তেমনি তাদের গায়কীও ছিল দর্শকের বেশ উপভোগ্য। যেখানে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি মূর্ত হয়ে উঠত।শ্যাম সুন্দর ও শেফালী ঘোষ জুটি আঞ্চলিক গানের জগতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কেননা এমন জনপ্রিয় জুটি আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শেফালী ঘোষকে নিয়ে রূপম চক্রবর্তী তৈরী করেছেন তথ্যচিত্র।
শেফালী ঘোষের ২০০ টিরও বেশি অডিও ভিডিও এ্যালবাম বাজারে রয়েছে। এছাড়া কলকাতা ও লন্ডনেও ক্যাসেট বের হয়েছে। শেফালী ঘোষ ব্যক্তিগত ভাবে আঞ্চলিক গান গেয়ে তৃপ্ত হতে চাননি। চট্টগ্রামে নিজস্ব সংস্কৃতিকে সাথে নিয়ে কাজ করতে গর্ববোধ করতেন। কারণ, চট্টলার ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে তথা সারা বিশ্বের বাঙালিদের কাছে এই গানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গান করে এমন জনপ্রিয়তা পাবেন তা শেফালী ঘোষেরও জানা ছিল না। তিনি প্রায়শ বলতেন আমার চট্টগ্রাম আমার জন্য অহংকার। কে আমাকে ঠকালো, কে আমাকে পয়সা কম দিলো, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার গান মিশে আছে সব মানুষের অন্তরে সবাই আমাকে ভালোবাসে এটি কোটি টাকার পাওয়ার চেয়ে বেশি।
১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রে নজরুল সংগীতে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত কর্ েবেতারে তাঁর প্রথম সংগীত পরিবেশিত হয় ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে..’ এই গানটি। ১৯৭০ সালে সর্ব প্রথম টেলিভিশনে তাঁর গান সম্প্রচার করা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান পরিবেশন করেন। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে গান গেয়ে অনুপ্রাণিত করেন। ১৯৭৪ সালে শেফালী ঘোষ প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। ১৯৭৮ সালে লন্ডনের প্রখ্যাত মিলফা লিমিটেড তাঁর গানের ১০ টি ক্যাসেট এবং লংপ্লে বের করে। ১৯৭৯ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রয়েল আলবার্ট হলে সংগীত পরিবেশন করেন। ঢাকা রামপুরা টেলিভিশনে কেন্দ্র উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি গান গেয়ে ভূয়সী প্রশংসা পান। বসুন্ধরা, মধুমিতা, সাম্পানওয়ালা, মালকাবানু, মাটির মানুষ, স্বামী, মনের মানুষ, বর্গী এল দেশে প্রভৃতি চলচ্চিত্রে কন্ঠদান করেন।
শেফালী ঘোষের মধ্যে রয়েছে ওরে সাম্পান ওয়ালা, আইওরে আইওরে কুডুম, লাল মিয়ার বাড়ী, থিয়া থিয়া ও লেদুনী, ছোড ছোড ঢেউ তুলি, আসকার দিঘীর, ন জানি বাঁধিত বারি, শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও, ও মারে মা, মুখক্কা গইল্যা কালা, নাতিন বরই খা, মাইট্টা কলসি, বাইক্কা টেয়া দে, বানুরে জি অ বানু, নাইয়র নিবা কই, গোলাবী ইবাকন, আঁরে কিল্লাই ভাব পর, মালকা বানুর দেশেরে, এক্কান কথা দুছার, বন্ধু আর দুয়ারদি, পইরর পাড়দি গরবা, আঁর বাড়ীত যাইও, ওরে বাস কণ্ট্রাকটার। এসব গানে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক চিত্রকল্প ভেসে উঠত।
বোয়ালখালীতে জেলা পরিষদের অর্থায়নে এ গুণি শিল্পীর সমাধিতে আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়। রাষ্ট্র তাকে একুশে পদক ছাড়াও স্বাধীন বাংলা শব্দ সৈনিক পদক, বাংলা একাডেমি আজীবন সম্মাননা পদক ও শিল্পকলা একাডেমি পদকে সম্মানিত করেছে।
Discussion about this post