চট্টগ্রাম, ১৯ মে, ২০২৪:
বাবরের পিতা মীর্জা ওমব শেখ ছিলেন সমরখন্দের বিখ্যাত চাঘতাই তুর্কবীর তৈমুরের পঞ্চম বংশধর ও মাতা কতলুঘ নিগার খানুম ছিলেন কারাকোরামের মোঙ্গল বংশীয় বিখ্যাততর চেঙ্গিস খানের ত্রয়োদশ অধস্তন বংশধরের কন্যা। বাস্তবিক পক্ষে বাবরের পিতৃবংশ বা পিতৃ-পরিচয় মাতৃবংশ কেহই মুঘল ছিল না।
তৈমুর ছিলেন ধর্মে মুসলিম, চেঙ্গিস ছিলেন শামানী বৌদ্ধ। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া হইতে বহু যাযাবর তুর্ক, তাতার, তুর্কোমান, মোঙ্গল, উজবেক প্রভৃতি জাতি ভারতে প্রবেশ করিয়াছিল। তাহারা সকলেই ভারতবাসীর নিকট সাধারণভাবে মুঘল নামে পরিচিত। বাবর বংশ পরিচয়ে ছিলেন তুর্কজাতীয় চাঘতাই শাখার সন্তান। কিন্তু চাঘতাই তুর্ক নাম ভারতের ইতিহাসে অচল। বাবরের প্রতিষ্ঠিত বংশ ভারতের ইতিহাসে মুঘল বংশ নামে পরিচিত। কথিত আছে, ভ্রম সহস্রবার উচ্চারিত হইলে সত্যরূপে বিকৃত হয়। ভারতের ইতিহাসে মুঘল নাম নির্বিচারে গৃহীত। মুঘল রাজবংশের সন্তানদের উপাধি ছিল মীর্জা।
বীর বাবরের জন্মস্থান ফরঘনা, বর্তমান পারস্য ও তুর্কীস্থানের মধ্যবর্তী অঞ্চল। জন্ম-১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দ। পিতা ওমর শেখ স্থূলবুদ্ধি হইলেও পুত্রের বাবরের জন্ম শিক্ষার ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। তুর্কী ছিল বাবরের পিতৃভাষা, ফার্সী ছিল তাঁহার অধীত ভাষা। বাবরের তুর্কী ভাষায় রচনা রসাল, ছন্দোময় গদ্য; তাঁহার ফার্সী ভাষায় রচনা গম্ভীর কিন্তু অপুষ্ট। শৈশব হইতে বাবর ছিলেন অতিমাত্রায় পক্ষ।
বাবরের ধর্ম: বাবর সুন্নী মুসলমান হইলেও হিংস্র পরধর্মদ্বেষী ছিলেন। না। প্রয়োজনের সময় বাবর পারস্যের সুন্নী-বিরোধী সাফাবী বংশীয় শিয়া সুলতানের সহিত মৈত্রী স্থাপন করিতে কুণ্ঠা বোধ করেন নাই। বাবর দ্বিধাহীন চিত্তে আল্লার অস্তিত্বে বিশ্বাস করিতেন, আজীবন যুদ্ধে সফলতাব জন্য আল্লার নিকট প্রার্থনা করিতেন, বিজয়লাভ করিলে আল্লার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেন। যুদ্ধ আরম্ভের পূর্বে কোরাণ-নিষিদ্ধ সুরাপানের জন্য অনুশোচনা করিয়াছেন এবং আল্লার অনুগ্রহেব জন্য সুরা বর্জন করিয়াছেন।
বিধর্মী হিন্দুর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে তিনি ধর্মযুদ্ধ বা জিহাদ বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন। খানুয়ার যুদ্ধের পর বিধর্মী হত্যা কবিয়া তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘গাজী’ বা বিধর্মী হন্তা উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। মেদিনী রাও পরাজিত হইলে তিনি দুর্গবাসী নিরপরাধ হিন্দুদিগকে হত্যা করিয়া আল্লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মুসলিম ফকিরের কবরে তীর্থযাত্রা করিয়া পুণ্য অর্জন কবিতেন। অযোধ্যা বিজয়ের পরে শ্রীরামচন্দ্রের বাসভূমি অযোধ্যার মন্দির ধ্বংস করেন এবং উহাব উপর মসজিদ নির্মাণ করেন। বাবর প্রার্থনায় বিশ্বাস করিতেন।
কথিত আছে, হুমায়ুনের রোগশয্যার পার্শ্বে প্রার্থনা করিয়া পুত্রের রোগ নিজ শবীরে আনয়ন করেন। ধর্মের ব্যাপারে বাবর অবশ্য পূর্বগামী মুসলিম বিজেতাগণ অপেক্ষা উদার ছিলেন, কিন্তু তিনি সমসাময়িক মুসলিম ধর্ম ও চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠিতে পারেন নাই।
পুরুষসিংহ বাবরের চরিত্র ও কৃতিত্ব: মধ্যযুগের ইতিহাসে বাবর এক অপূর্ব চরিত্র। কৈশোরে পিতৃহীন, মধ্যজীবনে রাজ্যহীন, শেষ জীবনে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা-বাবর ভারতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। বাবর দোষে-গুণে মানুষ ছিলেন; তাঁহার দোষ ছিল শত, গুণ ছিল সহস্র।
বাবর তাঁহার মাতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন, মাতামহী ও মাতামহকে ভালবাসিতেন, কিন্তু পিতার উল্লেখে অনেক সময় পরিহাস করিয়াছেন। তাঁহার বহু পত্নী ছিল। পত্নীদের প্রতি তিনি প্রীতিমান্ ছিলেন। বাল্যবন্ধু, যৌবনের সহচর, কর্মজীবনের অনুচরদের প্রতি বাবরের প্রবল আকর্ষণ ছিল।
প্রথম জীবনে অন্ত্যান্ত মীর্জাদের ন্যায় তিনি সুরাসক্ত ছিলেন, তাঁহার মানসিক শক্তি অসাধারণ ছিল বলিয়া খানুয়ার যুদ্ধের পূর্ব দিবসে চিরজীবনের সুরাপান অভ্যাস ত্যাগ করিতে পারিয়াছিলেন। মানসিক শক্তির অনুরূপ ছিল তাঁহার বাবরের আত্মবিশ্বাস দৈহিক শক্তি। তিনি ত্রিশ ঘণ্টা অবিরাম অশ্ব-পৃষ্ঠে ভ্রমণ করিয়াছেন, পথিমধ্যে দুইবার নদী সন্তরণ করিয়াছেন। তিনি দুই কক্ষ মধ্যে দুইটি মানুষকে নিবদ্ধ করিয়া প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিতে পারিতেন।
বাবরের দেহে ক্লান্তি-বোধ ছিল না। কোন বিফলতাই তাঁহাকে নিরুৎসাহ করিতে পারে নাই। আশা ও ভবিষ্যতে বিশ্বাস ছিল তাঁহার সকল কর্মের প্রেরণা, বাহিরে তাঁহার কর্ম-চাঞ্চল্য ছিল যথেষ্ট; ভাব-প্রবণতা ছিল চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। জীবনের পান-পাত্র তিনি আকণ্ঠ পান করিয়াছেন-যুদ্ধান্তে দিবস শেষে চন্দ্রালোকে মুক্ত নীলাকাশের নীচে বন্ধুবান্ধবসহ কাব্য, সংগীত ও সুরার সম্মেলনে সমবেত হইতেন; বন্ধুগণ প্রত্যেকে স্বরচিত অথবা কোন বিখ্যাত কবি রচিত কবিতা আবৃত্তি করিতেন। সম্মেলনের অন্তে বাবর বন্ধুদিগকে কবিতার সৌন্দর্য অনুযায়ী বিভিন্ন, বর্ণের সুরা পরিবেশনে সম্মানিত করিতেন, তারপর বিদায় গ্রহণ করিতেন। রাজপ্রাসাদ অপেক্ষা সৈন্য-শিবির বাবরের অধিকতর প্রিয় ছিল।
কাব্য ও কবিতা বাবরকে আনন্দ দিত। বাবরের তুর্কী রচনা ছিল সাবলীল ও নির্ভুল। তাঁহার রচিত আত্মজীবনী বা ‘তুজুক’ সমগ্র জীবনী-সাহিত্যের অপরূপ সম্পদ। নির্ভীকতা, গোপনহীনতা, সত্য সংবাদ পরিবেশন, প্রকৃতির প্রতি আবেদন এবং ভাষার সাবলীলতা বাবরের আত্মজীবনীকে অপূর্ব শ্রীমণ্ডিত করিয়াছে। ইহার মধ্যে আত্মপ্রচারের কোন উদ্দেশ্য নাই। তাঁহার রচিত তুর্কী কবিতা (দিওয়ান) অদ্যাপি তুর্কী কাব্য- রসিকদের চিত্ত বিনোদন করে। পারস্য ভাষায় বাবর
‘মুবাইয়ান’ নামক একপ্রকার নূতন ছন্দ আবিষ্কার করেন। একদিকে শিল্প, সংগীত ও সুরা বাবরকে আনন্দ দিত, অন্যদিকে যুদ্ধসজ্জা, রণবাদ্য ও শত্রুর রক্তস্রোত বাবরের বক্তধারা চঞ্চল করিয়া তুলিত। বাবরের চরিত্রে দুইটি ভিন্ন ধারার সম্মেলন সত্যই অপূর্ব।
বাবর ছিলেন যোদ্ধা পরিবারের সন্তান, জন্মে সৈনিক, সৈনিকের রক্তধারা তাঁহার রক্তস্রোতে নিত্যপ্রবাহিত। তাঁহার প্রতি শিরা-উপশিরা ছিল মোঙ্গল বীর চেঙ্গিস এবং তুর্কী বীর তৈমুরের রক্তধারায় উদ্বেলিত। মৃত্যুর সঙ্গে ছিল তাঁহার চিরবান্ধবতা; মৃত্যুই যেন তাঁহাকে বহুবার অনুগ্রহ করিয়া জীবন দান করিয়াছিল। যুদ্ধে বহুবার মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইয়া তৎক্ষণাৎ নূতন আগ্রহে জীবন বিপন্ন করিয়াছেন। সৈন্যদিগকে বিপদের সম্মুখে ফেলিয়া বাবর স্বীয় জীবন রক্ষার জন্য নিরাপদ আশ্রয় লাভের চেষ্টা করেন নাই। বিনিদ্র ও বিশ্রামহীন জীবন সৈন্যদের সঙ্গে বাবরও সমভাবে ভোগ করিয়াছেন। তিনি নিজের জীবনের মত সৈন্যদের ‘জীবনও মূল্যবান বিবেচনা করিতেন। সেই জন্য অনুচরগণ বাবরকে অত্যন্ত ভালবাসিত এবং প্রভুর জন্য যে-কোন দুঃখ-দৈন্য অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করিত।
বাবর অবশ্য পূর্বপুরুষ চেঙ্গিস, তৈমুর অথবা সমসাময়িক রাণা সংগ্রামের মত সুনিপুণ রণনেতা ছিলেন না। ফরঘনা, সমরখন্দ, উজবেকিস্থানের আত্মীয়দের সঙ্গে যুদ্ধে বাবর বিশেষ রণকৌশল প্রদর্শন করিতে পারেন নাই। সৌভাগ্যক্রমে বাবর তুর্কী গোলন্দাজ মুস্তাফা রুমী ও আলী খানের সাহায্য লাভ করিয়াছিলেন। ভারতবর্ষে তখনও গোলা, বারুদ, কামান আবিষ্কৃত হয় নাই। ভারতবর্ষে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষ যুদ্ধ করিত, যন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তখনও তাহাদের নিকট অজ্ঞাত ছিল।
যুদ্ধ জয়ের জন্য বাবর বহুবার শত্রুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা তাঁহার বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। পাণিপথের যুদ্ধের পশ্চাতে তাঁহার রণকৌশল, রণ- সম্ভার এবং শত্রুমধ্যে বিভেদ নীতি সমভাবে কাজ করিয়াছিল। পাণিপথের যুদ্ধে বিজয়ী না হইলে বাবরের নাম এশিয়ার ইতিহাস হইতে বিলুপ্ত হইত। সৈনিকরূপে বাবরের শ্রেষ্ঠ কীর্তি পাণিপথ ও খানুয়া বিজয়; ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ব্যাপারে বাবর পথপ্রদর্শক মাত্র। বাবর ভারতবর্ষে কোন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন নাই, অবশ্য সে সময়ও তাঁহার ছিল না। বাবরের রাজ্য তাঁহার মৃত্যুর দশ বৎররের মধ্যে শেষ হইয়া গিয়াছিল।
আকবরের আবির্ভাব না হইলে ঐতিহাসিকগণ বাবরকে তরমিসরী খানের মত একজন আক্রমণকারিরূপে উল্লেখমাত্র করিয়া তাঁহার কাহিনী সমাপ্ত করিতেন। হুমায়ুনের প্রতি ভ্রাতাদের জন্য রাজ্যাংশ বণ্টনের নির্দেশ দান করিয়া বাবর হুমায়ুনের পরাজয় এবং পরবর্তিকালে রাজপরিবারের মধ্যে সিংহাসনের জন্য দ্বন্দ্বের পথ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিলেন।
# লেখা- সংক্ষেপিত ও সঙ্কলিত, গ্রন্থ: ভারতবর্ষের বৃহত্তর পরিচয়(দ্বিতীয় খণ্ড)প্রথম প্রকাশ-১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ, লেখক: ড. মাখনলাল রায় চৌধুরী।
Discussion about this post