চট্টগ্রাম, ২৭ এপ্রিল,২০২৪:
সরকারি আইনগত সহায়তায় মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কারণে খরচ, আইন-আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার ঝামেলা থেকে রেহাই পাচ্ছে বিচারপ্রার্থী গরিব ও সহায় সম্বলহীন মানুষ। এ কারণে
সরকারি খরচে মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তি করছে সরকারি আইনগত সহায়তা সংস্থা। মূলত বিচার প্রার্থী দরিদ্র, সহায় সম্বলহীন নাগরিকদের জন্য হচ্ছে সরকারের এই আইনি সেবা।
২০০০ সনের আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ও ২০১৩ সালের সরকার একটি নীতিমালার মাধ্যমে এই আইনি সেবা শুরু করে। দরিদ্র জনসাধারণের ন্যায় বিচার দেওয়ার পাশাপাশি আদালতে মামলার চাপ কমানোও লিগ্যাল এইডের একটি লক্ষ্য। দেশের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে বিচারিক আদালত পর্যন্ত বিনা খরচে এই সেবা দেওয়া হয়। অসচ্ছল বিচার প্রার্থীর ওকালত ফি থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ খরচ বহন করে সরকার।
এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতিবছর ২৮ এপ্রিল বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালন করা হয় জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। এই বছরও দিবসটি পালন করা হচ্ছে ‘স্মার্ট লিগ্যাল এইড, স্মার্ট দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যের আলোকে।
সকল মানুষের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সংবিধানের ১৯ ও ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রদত্ত এই অধিকার নিশ্চিতে অসহায়-দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রণয়ণ করেন আইনগত সহায়তা প্রদান আইন ২০০০। এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা গরিব মানুষের আইনি সেবা নিশ্চিতে কাজ করছে চট্টগ্রামেও।
চট্টগ্রামেও জজ আদালত ভবনে আছে ‘লিগ্যাল এইড অফিস’। সারাদেশের মত সেখানে বিনামূল্যে অসহায় ও গরিব মানুষকে আইনজীবী নিয়োগ থেকে শুরু করে রায়ের কপি সরবরাহ পর্যন্ত মামলার সাথে প্রাসঙ্গিক সকল ধরনের ব্যয় পরিশোধে সহায়তা করা হয়।
এ ব্যাপারে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার
ও সিনিয়র সহকারী জজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, যারা মামলা করতে পারেনা আর্থিক কারণে, কিংবা কেউ বিবাদি হয়েছে যে কোনো কারণে তাদের সব ফি সরকার দিয়ে থাকে। অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। এছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। দেওয়ানী বিরোধের সমাধানও করা হয়। সেক্ষেত্রে ধনি-গরিব নির্বিশেষে সকলের জায়গা-জমির বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের উদ্যোগে অসহায় মানুষ যেমন বিনামূল্যে আইনি সেবা পাচ্ছে তেমনি স্বার্থের কারণে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব থেকে ভেংগে যাওয়া অনেক সম্পর্ক-ও জোড়া লাগছে।
তেমনই একটি ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও বড়ুয়া পাড়ায়। বড়ুয়া পাড়ার এই দুই ভাইয়ের জায়গা নিয়ে বিরোধ ছিল। সামনে না পিছে, রাস্তার পাশে না ভিতরে এই সামান্য বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তাদেরষ সম্পর্কের তিক্ততা। যা বাড়ির আঙিনা থেকে সমাজ হয়ে গড়ায় আদালতের আঙিনায়। অবশেষে বিষয়টা চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে রেফার করলে মাত্র তিন মাসের মধ্যে মীমাংসায় পৌঁছে দুই ভাই।
একাধিক বৈঠক শেষে বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তির শেষ ধাপে জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সার্ভেয়ার নিয়ে ঘটনাস্থলেই দুই ভাইয়ের দীর্ঘ দিনের বিরোধ মীমাংসা করেন।
সহজে বিচার নিষ্পত্তির এই প্রক্রিয়ায় দিন দিন সেবা গ্রহীতাদের আস্থা বাড়ছে এই বিশেষ আইনি সেবায়। চট্টগ্রাম আইনগত সহায়তা অফিসে ভিড় বাড়ছে বিচার প্রার্থীদের।
আরো দ্রুত স্মার্ট আইনি সেবা প্রদানের লক্ষ্যে অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এছাড়া এডিআর-বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে স্মার্ট মেডিয়েশন কার্যক্রম সংযোজন করা হয়েছে।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার
ও সিনিয়র সহকারী জজ মুহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, জেলা পরিষদের আর্থিক সহায়তায় স্থাপন করা হয়েছে স্মার্ট মেডিয়েশন রুম। এখানে বাদি-বিবাদি দুই পক্ষ মুখোমুখি কথা বলতে পারে। এজন্য সহায়তা করেন জেলা লিগ্যাড এইড অফিসার।
বিনা খরচে সরকারি এই আইনি সহায়তার বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জেলা ও মহানগর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত পালন করা হয় জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস।
এজন্য আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অধীনে প্রত্যেক জেলায় অফিস আছে। দেশ ব্যাপি উপজেলা লিগ্যাল এইড কমিটি আছে। যার সভাপতি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। সদস্য সচিব হচ্ছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এর বাইরে ইউনিয়ন কমিটি আছে।
বিভিন্ন আঙ্গিকে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল জনগণকে সচেতন করার জন্য জাতীয় আইন গত দিবস পালন করা হয়। কোর্টের স্টাফ ও ইমাম প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠান সহ নানা মাধ্যমে এই বিষয়গুলো জনগণকে জানানো হয়। অনেক সময় এলাকায় গিয়ে সমস্যার সমাধান করা হয়। এজন্য বিভিন্ন এনজিও কাজ করে।
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তদারকি আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এখানকার দুস্থ ও অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে ধনিক শ্রেণি, যারা মান সম্মানের ভয়ে আদালতে যেতে চাননা, তাদের কাছেও নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠছে এই কার্যক্রম।
বিচারক মুহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে গত বছর ১১০০ মামলা নিষ্পত্তি করেছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। প্রায় ১২০০ মামলায় আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। অন্য আদালত থেকে আসা ২০০ মামলার এক শতের মত মামলা নিষ্পত্তি করেছি। সবচেয়ে বড় সফলতা পারিবারিক সমস্যাগুলো আমরা আপোষের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করি। তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিন ১৫/ ২০ টা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করি।
Discussion about this post