#ড. মো. শফিকুল ইসলাম
বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ নামে পরিচিত হালদা নদী বাংলাদেশের স্বাদুপানির মাছের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্র। এই বাস্তুতন্ত্রে রয়েছে ৮৩ প্রজাতির ফিনফিশ, ১০ প্রজাতির শেলফিশ, গাঙ্গেয় ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণি। কিন্তু বর্তমানে হালদা বাস্তুতন্ত্রের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ক্রমশ জলজ প্রাণির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। অতিসম্প্রতি চলতি মাসে হালদা নদী থেকে ৩টি মৃত ডলফিন সংগ্রহ করা হয়েছিল। প্রথমটি ১৪ জুলাই – দক্ষিণ গহিরার বুড়ি সর্তা খাল, দ্বিতীয়টি ২০ জুলাই- আজিমারঘাট ও তৃতীয়টি ২১ জুলাই- আজিমারঘাট থেকে।
ডলফিন পানিতে বসবাসকারী স্তন্যপায়ী প্রাণী কিন্তু এরা মাছ নয়। মানুষের মতোই ডলফিন ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, বাচ্চা জন্ম দেয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাচ্চাকে দুধ পান করায়। ডলফিন একটি জলজ বাস্তুুতন্ত্রের পরিবেশের নির্দেশক ও প্রতিবেশের প্রহরীও বলা হয়। ডলফিনের অবস্থা ও সংখ্যা থেকে খুব সহজে জলজ বাস্তুুতন্ত্রের দূষণ পরিমাপ করা যায়। আবার একটি বাস্তুুতন্ত্রে ডলফিনের সংখ্যার বেশি হলে ঐ বাস্তুুতন্ত্রের মাছের পরিমাণও বেশি হবে। অতি-দুঃখের বিষয়, গত ২৫ জুলাই (সোমবার) হালদা নদীর রাউজানের কাগতিয়া স্লুইজ গেইট এলাকা থেকে প্রায় ৯ কেজি ওজনের একটি মৃত কাতলা মাছ এবং গতকাল ২৬ জুলাই (মঙ্গলবার) হাটহাজারীর গড়দুয়ারার নয়াহাট এলাকা থেকে সাড়ে ১২ কেজি ওজনের আরেকটি মৃত কাতলা মাছ পাওয়া যায়। হালদায় এক সপ্তাহে ৩টি ডলফিনের মৃত্যু এবং সপ্তাহ না পেরোতে ২ টি কাতলা মাছের মৃত্যু হালদা বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। যা হালদা নদীর বাস্তুতন্ত্রের দূষণকে নির্দেশ করে। এছাড়াও হালদা নদীর বিভিন্ন অংশে ও শাখাখালে অবৈধভাবে বিভিন্ন ধরনের জাল, বড়শি ও রাসায়নিক বিষ ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত মাছ ধরা হচ্ছে যা হালদা জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি। এমতাবস্থায় আমাদের জাতীয় সম্পদ হালদা নদীর বাস্তুুতন্ত্রকে স্বাভাবিক অর্থাৎ মাছ, ডলফিন ও অন্যান্য জলজ প্রাণির নিরাপদ বাসস্থান গড়ার লক্ষ্যে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- প্রতিরোধে প্রশাসনের পাশাপাশি হালদা সম্পর্কিত সবাইকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। হালদা নদীর বাস্তুতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ দূষণের মাত্রা জানতে হালদার পানি গুণাবলি পরীক্ষা করে দূষণের উৎস/স্থান নির্ণয় করা অতীব জরুরি। হালদা বাস্তুতন্ত্রকে তার চিরচেনা স্বাভাবিকরূপে এবং হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হালদা নদী উপর একাডেমিক অভিজ্ঞ গবেষকদের সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ দল গঠন ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে।
বাংলাদেশে সাত প্রজাতির ডলফিন পাওয়া যায় (ওটঈঘ-ইধহমষধফবংয-২০১৫)। যার মধ্যে গাঙ্গেয় ডলফিন (চষধঃধহরংঃধ মধহমবঃরপধ) মিঠাপানির নদীর প্রধান ডলফিন। যা স্থানীয়ভাবে শিশু, শুশ, হুস, হুচ্চুম, শুশুক ও ডলফিন নামে পরিচিত। এটি বর্তমানে দেশের একটি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। পদ্মা- ব্রহ্মপুত্র- মেঘনা এবং সাঙ্গু- কর্ণফুলী-হালদা ও অন্যান্য কিছু নদীতে পাওয়া যায়। ডলফিনের উপস্থিতি একটি নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের একটি নির্ভরযোগ্য সূচক। নদীতে ডলফিনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সেই নদীর বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি নির্দেশ করে। কিন্তু যদি সেই জনসংখ্যা হ্রাস পায়, তবে এটি সম্পূর্ণ জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি লাল পতাকা/ সংকেত হিসাবে বিবেচিত। এই ডলফিনকে প্রতি ৩০ থেকে ১২০ সেকেন্ডের মধ্যে একবার শ্বাস নেওয়ার জন্য পানির উপরে উঠে আসতে হয়। ডলফিন চোখে না দেখার কারণে প্রতিধ্বনি তৈরির মাধ্যমে চলাচল ও খাদ্যের অবস্থান নির্ণয় করে। এদের খাদ্যের তালিকা রয়েছে মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ অমেরুদ-ী প্রাণি। সারাবিশ্বে ডলফিন মৃত্যুর ৭০% কারণ হচ্ছে কারেন্ট জাল। ডলফিন চলাচলের সময় জালের অবস্থান প্রতিধ্বনির মাধ্যমে নির্ণয় করতে পারেনা (জালের সুতা শব্দ তরঙ্গ শোষণ করে)। যার কারণে সহজে জালে জড়িয়ে পড়ে। এছাড়া হালদা নদী থেকে সর্বশেষ প্রাপ্ত মৃত ডলফিনের গায়ে কোন আঘাতের চিহ্ন ছিলনা। হালদা নদীতে ডলফিন মৃত্যুর অন্যতম কারণ হচ্ছে অবৈধভাবে মাছ ধরার জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের জাল, বিশেষ করে কারেন্ট জালে আটকা পড়ে ডলফিন এর মৃত্যু হচ্ছে এছাড়াও ডলফিনের বয়সবৃদ্ধি খাদ্যের অভাব, দূষণ, পানির গুণাবলি পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পৃক্ত।
তাই হালদা নদীতে প্রতিনিয়ত গাঙ্গেয় ডলফিনের মৃত্যু হালদা বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। হালদা বাস্তুতন্ত্রকে ডলফিনের বসবাস উপযোগী করতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
১. নদীতে অবৈধভাবে যেকোন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।
২. নদীতে অতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল বন্ধ করতে হবে।
৩.হালদা নদী ও এর শাখা খালসমূহকে সম্পুর্ণ দূষণমুক্ত রাখতে হবে।
৪. হালদা ও শাখা খালে বিষ দিয়ে মাছ মারা বন্ধ করতে হবে।
৫. হালদার যে স্থানে ও শাখা খালে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, সেখান থেকে পলি অপসারণ করে হালদায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. নিয়মিত হালদা ও এর শাখাখালে পানির গুণাবলি পরীক্ষা করতে হবে।
৭. কমিউনিটি বেইজড ডলফিন ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে যেখানে বনবিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
৮. ডলফিনের পরিবেশগত গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্থানীয় জেলে ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৯. কৃষি জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার নিরুৎসাহিত এবং জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।
১০. ডলফিন ডাটাবেজ তৈরি করে নিয়মিত ডলফিনের সংখ্যা ও আবাসস্থল মনিটরিং করতে হবে।
১১. ডলফিন সংরক্ষণে আলাদা বিশেষজ্ঞ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে
১২.বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ -(ডলফিন ও তিমি আইন) -৩৭ তম ধারা সঠিকভাবে প্রয়োাগ করতে হবে।
লেখক পরিচিতি: ড. মো. শফিকুল ইসলাম, হালদা নদীর উপর পি-এইচ.ডি. ও এম.এস-সি. (থিসিস) ডিগ্রি অর্জনকারী হালদা গবেষক। প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান: জীববিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
Discussion about this post